বাড়ির পাশের গলি দিয়ে যে ভিখারিটা রোজ ভিক্ষে করে যায়। তার হাতে দুটো ভাত তু লে দিতে গিয়ে গানের
কলি কখানা মনে গেঁথে গেল বেশ। মনে পড়ে গেল, কদিন আগেই মায়ের বলা কয়েকটা কথা, “শ্যামা সঙ্গীত কটা
সময় থাকতে তোরা শিখে নিলি না?” এখানা মায়ের খুব পছন্দের গান। সবার আগে এখানাই শিখতে
চেয়েছিলাম। কালী যেন এখানে একটা এমন মানুষ যাঁকে আমরা আদ্যোপান্ত ভু ল বুঝে এসেছি। নাহলে কি আর
সাধক বামা খ্যাপা বলেছেন ওপরের কথা দুটো? আমার কালী কালো হলেও সে জগতে আলোই বিলিয়ে এলো।
মিছিমিছি সবাই মাকে ভয় পেয়ে ব্রাত্য করে রাখলাম, ঘরে এনে পূজো দিলাম শত শত বছরের পর।

ভারতীয় পুরাণে কালী চরিত্রের বিন্যাস আমাদের বরাবরই টেনেছে। কারণ আমরা মিলিয়ে ফেলেছি তাঁর সঙ্গে
সাধারণ মানুষের অমানবিক ক্রোধকে। রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য তো আমরা কখনও না কখনও হয়েইছি।
তাহলে দেবী যখন কালরাত্রি হলেন, আর কালরাত্রি থেকে কালী হলেন, তিনি কেন ভয়ঙ্করী? মনে পড়ে
নজরুলের লেখা কয়েকটা লাইন,

“কেন আমায় দেখাস মা ভয়,
খড়্গ নিয়ে, মুণ্ড নিয়ে?
আমি কী তোর সেই সন্তান,
ভোলাবি মা ভয় দেখিয়ে?”

তার মানে এটা প্রমাণিত যে বাঙ্গালী দেবী কালীকে, ঘরের মেয়ে, নিজের মায়ের স্তরে এনে ফেলেছে বহুদিন।
নাহলে, কোথাকার কে এক হালিশহরের জমিদারের কেরানি, তার ঘরের বেড়া এসে কেন দেবী একটা ছোট্ট
মেয়ের রূপে বেঁধে দেবেন? কেনই বা এক মন্দিরের পুরোহিতের হাত থেকে নিজে এসে ভোগ খেয়ে যাবেন?
কেনই বা একজন সাধকের স্বপ্নে এসে বায়না করে যাবেন তাঁকে ঘরেও পূজা করার? সাধক রামপ্রসাদ, শ্রী
রামকৃ ষ্ণ পরমহংস বা কৃ ষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, অথবা সাধক ভবা পাগলা, এই নাম গুলো আমাদের চেনা, জানার
পরিসরের মধ্যে… কিন্তু বাকি আরও চারদিকে কত কী হয়ে চলেছে, তার খবর রাখে কজনে?

এর আগে, অন্য এক সিরিজের পর্বে বলেছিলাম, কেমন করে দেবী পার্বতী কালরাত্রিতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন।
যা বলিনি, তা হল, এই রূপান্তরের পরিণাম কি ছিল। কারণ সে রূপ আমাদের কাছে যেমন বর্ণনা করা হয়, তার
থেকেও অনেক অনেক ভয়ঙ্কর! কিন্তু তার পরেও তাঁর নাম শুভঙ্করী, কেন জানেন? কারণ তিন আদ্যা শক্তি
মহামায়া, এই উগ্র রূপেও তিনি জগতের মঙ্গল সাধনের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছেন। যে কারণে তিনি মুছে দিতে
পেরেছিলেন রক্তবীজকে। কি ভাবছেন, কচু কা*টা হয়েছিল ওরা? আজ্ঞে না… প্রথমে লক্ষ লক্ষ রক্তবীজ দেবীর

জঠরানলে বলি হয়েছিল। সোজা বাংলায় কালরাত্রি ওদের খেয়ে ফেলতে শুরু করেছিলেন। আর বাকিরা কিভাবে
ধ্বংস হয়েছিল, আন্দাজ করে নিন বরং।

প্রথম দিকে এই কারণেই দেবীর পূজা হত শ্মশানে, ধারণা ছিল দেবী কালীকে গৃহে আমন্ত্রণ করা যায় না আর
পূজোও করা যায় না। কিন্তু এর অনেক বছর পরে কৃ ষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সঙ্কল্প নেন, যে তিনি দেবীকে বাড়িতে
পূজো করবেন। এতে, খানিক প্রচলিত নিয়ম রইল, কারণ শ্মশানে পূজিতা দেবীর রূপ বাড়িতে এলো না। আবার
দেবী বাড়িতে পূজো পেলেন আরও খানিক শান্ত স্বভাবা রূপে।

সামনে কালী পূজো, সবার কাছে একটা আলাদা সেন্টিমেন্ট। সব বাড়ির বাচ্চারা এক সঙ্গে বাজি পোড়াবে,
আলোয় সেজে উঠবে নগর, আরও একবার। তাই বং স্টোরিজের পাতায় এবার নিয়ে এসেছি নতু ন সিরিজ। এই
সিরিজে আমরা চেষ্টা করব পুরাণে পূজিতা কালী ও বাড়িতে পূজিতা কালীর সম্পর্ক , অভ্যুত্থান আর… না, এটা
বরং চমক হিসেবে থাক। ক্লু হিসেবে একটা ছবি দিলাম, বলুনত তো এটা কোথাকার ছবি?

ভালো থাকবেন সবাই, আলোয় থাকবেন।

তথ্যসূত্র ও আরও পড়া

  1. https://www.pandit.com/blogs/articles/the-story-of-maa-kalratri-the-fire-within-every-woman
  2. https://sadhana.app/?p=2323